Tuesday, August 11, 2015

হরিদাস ঠাকুরের মহিমা -১

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন গৃহস্থ ও অধ্যাপক লীলা করছিলেন তখন সমস্ত দেশ আধ্যাত্মিক বিষয়ে শূন্য ছিল। যদিও কেউ, গীতা ভাগবতাদি শাস্র সমূহের ব্যাখ্যা করত। কিন্তু তাদের সেই ব্যাখ্যায়-'ভগবান শ্রীকৃষ্ণে ভক্তি করাই জীবনের উদ্দেশ্য' তা শোনা যেত না।অতি অল্পসংখ্যক শুদ্ধভক্ত সম্মিলিত ভাবে নির্জনে পরস্পর হরিনাম সংকীর্তন করতেন। তা দেখে সকলেই তাঁদের পরিহাস ও নির্যাতন করত। ভক্তগণ তাঁদের মনের বেদনা কাকে বলবেন? 
এমন সময় নদীয়ায় হরিদাস ঠাকুর এসে উপস্থিত হন। হরিদাস ঠাকুর বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানার কেঁড়াগাছি (বুঢ়ন) গ্রামে আবির্ভূত হন। তাঁর কৃপার প্রভাবে সেই স্থানে হরিনাম সংকীর্তনের ব্যাপক প্রচার হয়। তিনি গঙ্গাতীরে বাস করার অছিলায় প্রথমে নদীয়া জেলার ফুলিয়ায় এবং তারপর শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈতাচর্যের সঙ্গে মিলিত হন। হরিদাস ঠাকুর সর্বদা হরিনাম সংকীর্তনে মগ্ন ছিলেন তা দর্শন করে ফুলিয়ার ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁর প্রতি বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল হলেন। 

এমন সময় হরিদাস বিরুদ্ধে মুলুক-অধিপতির নিকটে মহাপাপী কাজী অভিযোগ করলেন যে, হরিদাস যবন কূলে লালিত পালিত হয়েও হিন্দুর ভগবানের নাম কীর্তন ও প্রচার করছেন। মুলুকপতি হরিদাস ঠাকুরকে ধরে আনার জন্য সৈনিক পাঠালে তিনি নির্ভয়ে কৃষ্ণনাম করতে করতে যবনাধিপতিকে দর্শন দিলেন। কারাগারে বন্দি কয়েদীরা ঠাকুর হরিদাসকে দর্শন করার জন্য কারা রক্ষকের কাছে বিশেষভাবে অনুনয় বিনয় করলে হরিদাস ঠাকুর কারাগারে এসে কয়েদীর বিষয় ভুলে সর্বদা হরিনাম 

কীর্তন করার উপদেশ দিলেন। মুসলমান অধিপতি হরিদাস ঠাকুরকে হিন্দুধর্ম গ্রহণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে হরিদাস ঠাকুর উত্তরে জানালেন যে, সকলেরই ঈশ্বর এক অদ্বয়জ্ঞানতত্ত্ব। তিনি পরমাত্মারূপে সকলের হৃদয়ে অবস্থান করেন এবং যাকে যেভাবে পরিচালিত করেন সে সেইভাবেই কাজ করে মুলুকপতি হরিদাস ঠাকুরকে শাস্তি ভয় দেখিয়ে নিজের মুসলমান ধর্ম পালন করতে নির্দেশ দিল। হরিদাস ঠাকুর বললেন যে, তাঁর শরীর যদি খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, শরীর থেকে প্রাণ যদি বেরও হয়ে যায় তবুও তিনি হরিনাম সংকীর্তন ছাড়বেন না, কারণ এটিই জীবের প্রকৃত ধর্ম। কাজীর আদেশ অনুসারে বাইশ বাজারে দুষ্টগণ অতি নিষ্ঠুরভাবে ঠাকুরকে বেত্রাঘাত
করতে লাগলেন। তবুও ঠাকুরের শ্রীঅঙ্গে কোন প্রকার দুঃখের চিহ্ন প্রকাশিত হল না বা প্রাণত্যাগও করলেন না। তা দেখে মুলুকপতির
অনুচরেরা বিস্মিত হল। হরিনাম সংকীর্তনের আনন্দে হরিদাস ঠাকুর সর্বক্ষণ মগ্ন থাকয় প্রহ্লাদ মহারাজের ন্যায় এত কঠোর বেত্রাঘাতেও তাঁর কোন কষ্ট হল না, বরং তিনি অত্যাচারীদের মহাবৈষ্ণব অপরাধ থেকে মুক্ত করার জন্য ভগবানের নিকটপ্রাথনা করছিলেন। হরিদাস ঠাকুর যখন জানতে পারলেনতিনি দেহত্যাগ না করলে এই সৈনিকদের প্রাণদণ্ড হবে তখন তিনিসমাধিস্থ হলেন। তখন তাঁর শরীরেবিশ্বম্ভরের অধিষ্ঠান হওয়ায় শত চেষ্টা করেও সৈনিকেরা হরিদাস ঠাকুরকে নাড়াতে পারল না। পাষণ্ডী কাজী হরিদাস ঠাকুরের অসৎগতি হওয়ার জন্য তাঁকে কবর না দিয়ে গঙ্গায় নিক্ষেপ করতে নির্দেশ দিলেন। এইভাবে হরিদাস ঠাকুর গঙ্গায় ভাসতে ভাসতে যখন বাহ্যদশা ফিরে পেলেন তখন পুনরায় হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে ফুলিয়া গ্রামে এলেন। যবনগণ হরিদাস ঠাকুরের ঐশ্বর্য দর্শন করে সকলেই অভিভূত হয়ে পীর জ্ঞান করতে লাগলেন। মুলুকপতি এসে জোড় হাতে তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং রাজ্যে হরিনাম সংকীর্তন করার জন্য অনুমতি দিলেন।


ফুলিয়ার ব্রাহ্মণ সমাজ পুনরায় হরিদাস ঠাকুরকে পেয়ে বিশেষভাবে আনন্দিত হলেন। হরিদাস ঠাকুর দৈন্যভাবে বললেন যে, বিষ্ণুনিন্দা শ্রবণ করার ফলে তাঁর মহা অপরাধ হয়েছিল কিন্তু সৌভাগ্যবতঃ এই অল্প শাস্তি পেতে হল। গঙ্গাতীরে এক গুহায় যেখানে এক ভয়ঙ্কর সাপ থাকত সেখানে হরিদাস ঠাকুর তিনলক্ষ হরিনাম করতে লাগলেন।  সেই সাপ হরিদাস ঠাকুরের ইচ্ছাক্রমে সেইথান ত্যাগ করে চলে যায়।

For more information please click here and like